মনজুরুল হক
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। সোমবার ঢাকায় পৃথক দুই অনুষ্ঠানে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যদিও চুক্তি প্রকাশ্যে হয়েছে, তবে বিস্তারিত শর্তাবলী এবং সংবেদনশীল তথ্য সরকার প্রকাশ করছে না।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ৩০ বছরের জন্য ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। পিপিপি প্রকল্পের আওতায় এ টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে ২৫০ কোটি টাকা ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে প্রদান করা হয়েছে।
অপরদিকে, ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ২২ বছরের জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এস-এর হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই টার্মিনালে প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে এবং সরকারকে ১৮ কোটি টাকা সাইনিং মানি হিসেবে প্রদান করা হয়েছে।
পিপিপি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক চৌধুরী বলেন, “লালদিয়া প্রমাণ করেছে যে পিপিপি শুধু তত্ত্বে নয়, বাস্তবেও কার্যকর। ভবিষ্যতেও অবকাঠামো উন্নয়নে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।” তিনি উল্লেখ করেন, আগামী কয়েক বছরে চারটি নতুন বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলাম। স্কপ হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, চুক্তি বাতিল না হলে আগামী ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে শ্রমিক কনভেনশন থেকে হরতাল ও রোড অবরোধসহ কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “যারা চুক্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না, তাদের বোঝার আহ্বান জানাই। বিরোধিতা করার স্বাধীনতা আছে, তবে দেশের স্বার্থও বিবেচনা করতে হবে।”
চুক্তিটি শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, মালাক্কা প্রণালী এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কনেক্টিভিটির সঙ্গে জড়িত। বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সামরিক কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, গোপনীয়তা এবং জাতীয় স্বার্থ যাচাই না করার কারণে এই সিদ্ধান্তকে সমালোচনামূলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। শ্রমিক-কর্মচারী ও ব্যবসায়ী সমাজের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি অপারেটর শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দক্ষতার হ্রাস ঘটতে পারে।
ইতিহাসের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাথমিক বাণিজ্যিক দখলের মতোই এই চুক্তি কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা বহন করছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য শক্তি চক্রের কৌশলগত প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর কাছে এবং চীনের মিয়ানমার ও BCIM করিডরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সমালোচনা অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলো যথাযথ প্রতিবাদ না করে সীমিত বা হালকা প্রতিবাদ করছে। বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দর দেওয়া হলে দেশের বাণিজ্য, শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
মন্তব্য করুন