নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর দেশজুড়ে বেড়ে গেছে হত্যাকাণ্ড। সূত্র বলছে, এর পেছনে রয়েছে বিএনপির চাঁদাবাজি ও মব সন্ত্রাস। গত দুইদিনে অন্তত পাঁচজনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়।
গাজীপুরের চৌরাস্তায় গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে আসাদুজ্জামান তুহিন নামে এক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানাধীন স্টেশন রোডের ফুটপাতে পরিত্যক্ত একটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এর আগে গত বুধবার ৬ আগস্ট পঞ্চগড়ের জাবেদ রহমান জয় (১৯) নামে এক ছাত্রদল কর্মী প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডে যখন পুরো দেশে সমালোচনার ঝড় বইছিল তখন নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুরে প্রাইভেটকার থামিয়ে সাইদুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রাইভেটকারের ভেতরই তার গলা কাটা হয়। বাঁচতে তিনি বেরিয়ে আসলেও কোথাও যেতে পারেননি। ওই প্রাইভেটকারেই লেগে ছিল তার রক্ত। আর পাশে পড়েছিল মরদেহ।
অপরদিকে সিলেটের মৌলভীবাজার শহরের ব্যস্ততম শমশেরনগর রোডে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফয়জুর রহমান রুবেল নামে ৪২ বছর বয়সী ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি মৌলভীবাজার শহরের শমশেরনগর রোডের সদাইপাতি মার্কেটস্থ এফ রহমান ট্রেডিং এর মালিক ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যার পর দোকানে একা ছিলেন রুবেল। এ সময় হঠাৎ তিন থেকে চারজন দুর্বৃত্ত দোকানে ঢুকে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায়।
এরপর সিলেট নগরের কতোয়ালী মডেল থানার পার্শ্ববর্তী ক্বীনব্রীজ এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ডালিম নামে এক যুবক নিহত হন। তাকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করা হয়। স্থানীয় জনতা ও পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করে দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে গত জুনে লন্ডনের ডোরচেস্টার হোটেলে তারেক রহমান ও ড. ইউনূস-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠনের পর দেশজুড়ে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যায়।
গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বিএনপির সন্ত্রাসীদের আরও যত অপকর্ম
পুরান ঢাকায় যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতায় এক ভাঙাড়ির ব্যবসায়ীকে পাথর মেরে হত্যা করা হয় এবং তার মৃতদেহের ওপর নৃত্য করা হয়—এমন বর্বরতা শুধু নিন্দনীয়ই নয়, গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় ৪,৫০০ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবুও সহিংসতা থেমে নেই। গত জুলাইয়ে খুলনার মাহবুব মোল্লা নামের এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়।
গত ২৯ জুন নারায়ণগঞ্জের বন্দরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধের জেরে মহানগর বিএনপির সাবেক এক সহ-সভাপতিকে বিবস্ত্র করে মারধরের ঘটনা ঘটেছে।
গত ১৩ মে,ঢাকার আদালত বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীদের দ্বারা নারী বিচারক মমতাজ বেগমকে ধাওয়া। গত ২ জুলাই যশোরে প্রতিবন্ধী রফিকুল ইসলামকে গাছে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
গত ৩ জুলাই ফরিদপুরে হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদের বাড়িতে হামলা চালায় স্থানীয় বিএনপির কর্মীরা। কুমিল্লায় মাদক কারবারী সন্দেহে এক পরিবারের তিনজনকে হত্যা, ধর্ষণের ঘটনায় বিবস্ত্র করে মারধর করা হয়। এখানেও বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। গত ২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে আদালত চত্বরে বিএনপি আইনজীবীদের হাতে মারধরের শিকার সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণার পরপরই সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। নির্বাচনের আগে চাঁদাবাজি, এলাকা দখল এবং ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ধরণ ও ঘনত্ব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে নির্বাচনী পরিবেশ ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।
তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ও দৃঢ় পদক্ষেপ, পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহিংসতা পরিহারের প্রতিশ্রুতি ছাড়া এই পরিস্থিতি থামানো কঠিন হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে হলে সহিংসতার প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবায়ন জরুরি।
মন্তব্য করুন