নিজস্ব প্রতিবেদক
চলতি বছর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী তিনটি যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে দুটি মহড়া—‘টাইগার লাইটনিং’ ও ‘টাইগার শার্ক’ জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আর তৃতীয়টি ‘প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল’ হবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে। রোববার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কৌশলগতভাবে একটি “প্রক্সি যুদ্ধের” প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের ভাষায়, এই মহড়াগুলো দৃশ্যত সামরিক সহযোগিতার নামে অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের একটি পর্বমাত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের “চূড়ান্ত পরিকল্পনার অংশীদার” হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। এমনকি একাধিক সূত্র দাবি করছে, জাতিসংঘ মহাসচিব বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ড. ইউনূসকে ব্যবহার করছে মার্কিন প্রশাসন।
তারা আরও আশঙ্কা করছেন, এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে অজুহাত করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ, মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ২৩ মে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে "পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ" গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশে এয়ার বেজ স্থাপনেরও প্রস্তাব এসেছে, যদিও কোন দেশ প্রস্তাব দিয়েছে, তা তিনি তখন প্রকাশ করেননি।
সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের একটি স্থায়ী মিশন বাংলাদেশে স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সমালোচকদের ভাষায়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ এবং “আমেরিকার স্বার্থ বাস্তবায়নের কৌশলগত ধাপ”। অনেকে বলছেন, এটি “দেশকে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র” এবং ড. ইউনূস সেই চক্রান্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ববর্তী বক্তব্য আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস খোলার পরই সেখানে বিভাজন শুরু হয়েছিল। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশেও সেই রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এদিকে পহেলা অগাস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ 'পাল্টা' শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই বার্তা দিয়ে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে তিন মাস ধরেই এ নিয়ে আমেরিকা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ দলে অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুরের মতো ব্যক্তির অর্থনীতির বিষয়ে সংযুক্ত থাকা হাস্যকর। সেখানে অর্থনীতি নয় বরং কীভাবে বাংলাদেশকে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দেওয়া যায় সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার জন্য আমেরিকায় যাওয়ার বাণিজ্য উপদেষ্টা নেতৃত্বে থাকা প্রতিনিধি দলটির অর্জন শূন্য। তাদের সফর নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে ব্যর্থতার অভিযোগ, আলোচকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ এবং খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা উচিত ছিল। তবে "নন ডিসক্লোজার ক্লজ দেয়ার কারণে কী আলোচনা হচ্ছে সে সম্পর্কে কেউ অবগত ছিল না। ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে আলোচকদের 'যোগ্যতা' নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে বঙ্গোপসাগর, রোহিঙ্গা করিডোর, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর ও কৌশলগত ভূখণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন