নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আগামীকাল ৫ আগস্ট আয়োজিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষকে উপস্থিত করতে সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। সারাদেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আনতে ভাড়া করা হয়েছে আট জোড়া বিশেষ ট্রেন। পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে সমাবেশে অংশগ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মালিকপক্ষকে।
জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান ঘিরে যখন মানুষের মধ্যে কিছুটা উদাসীনতা ও হতাশা দেখা যাচ্ছে, তখন এমন ব্যয়বহুল সরকারি উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সরকারি অর্থে ট্রেন ভাড়া: উঠছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তহবিল থেকে এই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যয় জনগণের করের টাকা থেকে করা হচ্ছে, যা অনৈতিক এবং অগ্রহণযোগ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, “জনগণের অর্থ ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোক আনানো সরকারি সম্পদের অপব্যবহার। এটি আওয়ামী লীগের আমলে দলীয় সমাবেশে যেভাবে লোক আনা হতো, সেই কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।”
তার মতে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ একটি স্বতঃস্ফূর্ত জনআন্দোলন ছিল। সেই চেতনায় সরকারি ছোঁয়া দিলে তার মৌলিক উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছুটি ও চাপ: শ্রমিক নেতাদের ক্ষোভ
সরকারের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি তাদের সমাবেশে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার নির্দেশনা দেওয়ায় উঠেছে মানবাধিকার ও শ্রমিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ।
শ্রমিক অধিকার সংগঠনের নেত্রী নাসিমা আক্তার বলেন, “এই ধরনের চাপ প্রয়োগ শ্রমিকদের স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর আঘাত। অনেক শ্রমিক এই সমাবেশে অংশ নিতে চান না, কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে বাধ্য হচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকদের দিয়ে সমাবেশ ভরানোর চেষ্টা অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক প্রয়াস, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।”
সরকারি উদ্যোগে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’: গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সংগঠন জানিয়েছে, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ জনগণের আন্দোলনের ফসল। এটি সরকারি উদ্যোগে পাঠ করা হলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাবে।
রাজনৈতিক কর্মী ও সাবেক ছাত্রনেতা ফরিদুল ইসলাম বলেন, “যে ঘোষণাপত্র জনগণের দাবিতে তৈরি, সেটিকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় উপস্থাপন করলে সেটি জনগণের না হয়ে সরকারের প্রচারণা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা এই ঘোষণাপত্রকে অংশীজনদের সম্মতি ছাড়া মানি না।”
স্বচ্ছতার অভাব ও জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আয়োজনের পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য মূলত জনসমর্থন প্রদর্শন ও জনপ্রিয়তা বাড়ানো। তবে তারা এটিও বলছেন, এতে জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হচ্ছে না।
সরকারের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
পরিকল্পনাবিদ ও সুশাসন বিষয়ক গবেষক রাশেদ খান বলেন, “৩০ লাখ টাকার বেশি খরচ কোথায়, কীভাবে হচ্ছে — তার নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। এটি জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস এবং সরকারের জবাবদিহিতার সংকট তৈরি করতে পারে।”
মন্তব্য করুন