নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির বিষয়টি সামনে আসার পর দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি সমঝোতা চুক্তির আওতায় আনতে চাচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
রোববার (১৩ জুলাই) সচিবালয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বন্দর ও রাজস্বকে অধিকতর গতিশীল করতে গঠিত কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "গত কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এরপর আলোচনা হবে শুল্ক ও অশুল্ক (ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ) বিষয়ে।"
উপদেষ্টা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কৌশলগত ইস্যু রয়েছে, যার মধ্যে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অন্যতম। "আমরা আশা করছি, এসব বিষয়ে ১ আগস্টের আগেই আলোচনা শেষ হবে এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বার্থ সংরক্ষণে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে," বলেন ফাওজুল কবির।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগের পেছনে চীন একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ যেন তার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) পক্ষে থাকে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিস্তৃত কৌশল, যার লক্ষ্য হচ্ছে পুরো অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করা।
পহেলা অগাস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ 'পাল্টা' শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই বার্তা দিয়ে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে তিন মাস ধরেই এ নিয়ে আমেরিকা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ দলে অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুরের মতো ব্যক্তির অর্থনীতির বিষয়ে সংযুক্ত থাকা হাস্যকর। সেখানে অর্থনীতি নয় বরং কীভাবে বাংলাদেশকে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দেওয়া যায় সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে, উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম বৈঠকে বাংলাদেশে তিন বছরের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের একটি অফিস স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের এক নতুন ধাপ এবং একটি সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের অংশ।
তাদের দাবি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি একটি নীলনকশার অংশ, যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের আধিপত্য বিস্তার। জাতিসংঘের অফিসের মাধ্যমে ‘মানবাধিকার’ ইস্যুকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, এবং চট্টগ্রাম বন্দর—সব মিলে এই অঞ্চলটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি “খ্রিস্টান রাজ্য” গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেকে, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগেও সতর্ক করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা বাংলাদেশে একটি এয়ার বেজ স্থাপনের মাধ্যমেও এসেছে।
একাধিক সূত্র ও বিশ্লেষকের মতে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই ষড়যন্ত্রে “প্রক্সি নেতা” হিসেবে ব্যবহার করছে বাইডেন প্রশাসন। তাদের দাবি, তাঁকে জাতিসংঘ মহাসচিব করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাধা এবং বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যেন অন্য কোনো শক্তির হাতিয়ার হয়ে না পড়ে—সেই বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার জন্য আমেরিকায় যাওয়ার বাণিজ্য উপদেষ্টা নেতৃত্বে থাকা প্রতিনিধি দলটির অর্জন শূন্য। তাদের সফর নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে ব্যর্থতার অভিযোগ, আলোচকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ এবং খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা উচিত ছিল। তবে "নন ডিসক্লোজার ক্লজ দেয়ার কারণে কী আলোচনা হচ্ছে সে সম্পর্কে কেউ অবগত ছিল না। ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে আলোচকদের 'যোগ্যতা' নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
মন্তব্য করুন