নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়। সহিংসতা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং বিচারবহির্ভূত অপরাধের লাগামহীন উত্থানের মধ্যে প্রেস উইংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
সোমবার (১৪ জুলাই) ইউনূস সরকারের প্রেস উইং এক বিবৃতিতে জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানের আলোকে বলা “অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে”—এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও জননির্যাতনের অভিযোগকে ‘মব’ নয় ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কার্যত এই সন্ত্রাসকে বৈধতা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের দাবির বিপরীতে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে খুন হয়েছে ১ হাজার ৯৩০ জন। মাসভিত্তিক খুনের সংখ্যা: জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০, মার্চে ৩১৬, এপ্রিল ৩৩৬, মে ৩৪১ এবং জুনে সর্বোচ্চ ৩৪৩। সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন, ঢাকা রেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে।
প্রতিদিন গড়ে ১১টি খুনের ঘটনায় জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতির আড়ালে জঙ্গিরা সক্রিয়ভাবে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।
গণমাধ্যমকে দায়ী করে মবকে বৈধতা
২৬ জুন সিরডাপ মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “বলা হচ্ছে মব তৈরি হচ্ছে, আমি এটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেসার গ্রুপ। সেটা তৈরি হচ্ছে সাংবাদিকতার ব্যর্থতার কারণে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং হিংস্রতা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে, যার ফলশ্রুতিতে এই জনরোষ তৈরি হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ধারাবাহিকতা
রাজধানী ঢাকায় মিটফোর্ডের সামনে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী সোহাগকে পিটিয়ে ও ইট-পাথরে আঘাত করে হত্যা করে বিএনপির নেতা-কর্মীরা। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে, ১ জুন বিএনপির দুই নেতা মহব্বত হোসেন ও ইউনুছ আলী নিজেদের দলের দ্বন্দ্বে নিহত হন।
খুলনার দৌলতপুরে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করা হয়। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গে মন্তব্য এড়িয়ে যান।
নারী ও শিশু নির্যাতন, ডাকাতি ও মব-নির্ভর হত্যা
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৩৬৬টি, সবচেয়ে বেশি ফেব্রুয়ারিতে (৭৪টি)। একই সময়ে ১১,০০৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ।
৩ জুলাই কড়ইবাড়ী গ্রামে মা, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতাও বেড়েছে। গত এক বছরে অন্তত ২৬ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী পুলিশের হেফাজতে নিহত হয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। মব তৈরি করে শত শত নেতা-কর্মী হত্যার অভিযোগও উঠেছে। রাজশাহীতে শিশু সন্তানের জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে হামলায় মারা যান আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। মাগুরায় একজনকে জীবন্ত কবর দেয়া হয় এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে। ছাত্রলীগ নেতা শাকিলের পা কেটে নেয়া হয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ছাত্রলীগ নেতা তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করে শিবির ও বর্তমান এনসিপি নেতারা।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ নিচ্ছে।” বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচারহীনতা, ন্যায়বিচারের অভাব এবং সহিংসতা প্রশ্রয়ের কারণে মব-নির্ভর বিচার ও খুন ক্রমশ ‘নতুন স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে এমন মবকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ আখ্যা দিয়ে কার্যত বৈধতা দেওয়া ভয়ংকর বার্তা বহন করে। এটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো, মানবাধিকার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
মন্তব্য করুন