নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ আজ নতুন এক ষড়যন্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও পাকিস্তানি চিন্তাধারা থেকে প্রেরণা নেওয়া গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন আনার প্রস্তাব, যা এসেছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকেই। এই প্রস্তাবের আড়ালে আসল উদ্দেশ্য হলো বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীকে সংসদে প্রবেশ করানো এবং তাদের মাধ্যমে নতুন এক সাংবিধানিক নীলনকশা বাস্তবায়ন করা।
কনফেডারেশনের গোপন পরিকল্পনা
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানপন্থী চক্র বাংলাদেশকে একটি কনফেডারেশনের আওতায় আনার ষড়যন্ত্র করছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশে পরিণত করার প্রচেষ্টা চলছে।
দেশের নাম পরিবর্তন করে রাখা হবে “পশ্চিম পাকিস্তান”
পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একত্রিত হয়ে ভারতের কয়েকটি রাজ্য দখল বা বিচ্ছিন্ন করার স্বপ্ন তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই আলোচনা ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তরুণদের বোঝানো হচ্ছে “বাংলাদেশ একা টিকতে পারবে না, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হলেই মুসলিম বিশ্ব শক্তিশালী হবে।”
বিএনপি–জামাত ও জঙ্গি গোষ্ঠীর লক্ষ্য
বিএনপি ও তাদের সহযোগী জামাত সবসময় পাকিস্তানি রাজনীতির ধারক-বাহক ছিল। এখন তারা পিআর পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে সংসদে ঢুকে সংবিধান পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে চরমোনাই, হেফাজতসহ আরও কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানি ধাঁচের রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া।
ইসলামী দলগুলোকে ড. আলী রিয়াজ পিআর পদ্ধতির দাবিতে মাঠে নামতে বলেছেন। আর ড. ইউনুস ও সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান বিএনপিকে নিশ্চিত করেছেন, “পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে বিএনপিই সরকার গঠন করবে।”
তিন দিনের সফর সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। ১৩ বছর পর এটি ছিল পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান এক করার মিশন নিয়ে ঢাকায় এসেছেন ইসহাক দার। এ সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিগত ১৫ বছর গোপনে গোয়েন্দা তৎপরতা চালালেও বৈরিতার মুখে বারবার হোঁচট খাওয়া আইএসআই মরিয়া এখন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে। বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় আইএসআইয়ের তৎপরতা আলোকে সামনে বিপদের আশংকা প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
তারা বলছেন, ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ বহু নাশকতার সঙ্গে যুক্ত আইএসআই আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে নতুন করে নাশকতার বড় ছক আঁটছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সফরের আগে পাকিস্তানের গণমাধ্যম ও কিছু অনলাইন পোর্টালে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি তোলা হয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছে এবং পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধাপরাধ অস্বীকার করছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতারাও বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশকে পাকিস্তান বলে উল্লেখ করছেন এবং শিবির পাকিস্তানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তারা যুদ্ধাপরাধীদের আড়াল করে প্রদর্শনী করায় সমালোচনা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এসব উসকানিমূলক মন্তব্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে পাকিস্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিটা কার্যত প্রহসনে পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি জামায়াতকে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিদায়ী পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের হঠাৎ প্রস্থান এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিও আলোচনায় এসেছে। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান, জামায়াত ও শিবির আবারও বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, আর সরকারের নীরব অবস্থান তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর ভয়াবহ ষড়যন্ত্র চলছে—এমন তথ্য সামনে আসছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ, বিদেশি অর্থায়ন এবং ইসলামাবাদের রাজনৈতিক-গোয়েন্দা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হয় পাকিস্তান। গত মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তিনি জানান, সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তান-বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে। এ নিয়ে সমালোচনাও হয় ব্যাপক।
অনেকেই বলেন, যেখানে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী বিভিন্ন সংগঠন বেশ সক্রিয় তারা কীভাবে আরেক দেশের সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে? এর আগে দুই দেশের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ। এত গেল কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ।
গত জুনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিন ব্রিগেডিয়ার ঢাকা সফরে আসেন এবং সরাসরি কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসে যান, যেখানে ১০ম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর অবস্থিত। সাবেক এক বাংলাদেশি মেজর জেনারেল বলেন, “তারা নিঃসন্দেহে গুপ্ত মিশনে ছিলেন, না হলে হঠাৎ রামুর মতো সংবেদনশীল ঘাঁটি সফরের কারণ কী?”
রামু সেনানিবাস বর্তমানে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। ফলে এ সফরকে অনেকেই স্বাভাবিক কূটনৈতিক ভ্রমণের বাইরে এক ধরণের গোপন সামরিক নকশা হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতেই বাংলাদেশ জঙ্গিরাষ্ট্র বানাতে চায় পাকিস্তান। আর এ জন্য তারা সবসময়ই বিএনপি জামায়াতকে কাজে লাগিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি এই ষড়যন্ত্র সফল হয়, তবে বাংলাদেশের সামনে ভয়ংকর বিপদ নেমে আসবে। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় বিলুপ্ত হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়া হবে। দেশটি পরিণত হবে একটি যুদ্ধমুখী রাষ্ট্রে, যেখানে তরুণদের ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঠেলে দেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু গণতন্ত্র নয়, বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বও চরম হুমকির মুখে পড়বে।
সতর্কতার সময় এখনই
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে লাখো প্রাণের বিনিময়ে, মুক্তিযুদ্ধের অসীম ত্যাগের মধ্য দিয়ে। আজ যদি আমরা উদাসীন হই, তবে সেই অর্জন বিলীন হয়ে যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন জনগণকে সত্য জানানো, যাতে তারা ষড়যন্ত্রকারীদের চিনতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার থেকে রক্ষা করা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা। আজ আমাদের সামনে দুটি পথ হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয় ধরে রাখা, নয়তো ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে দেশকে আবারও পাকিস্তানি শাসনের অঙ্গীকারে সমর্পণ করা।
মন্তব্য করুন