নিজস্ব প্রতিবেদক
বগুড়ার ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ি কলেজপাড়া— একসময় যেটি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শান্তির প্রতীক, আজ সেটি রূপ নিয়েছে আতঙ্কের জনপদে। কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার প্রতিদিন কাটাচ্ছে ভয়ের মধ্যে। গত শনিবার কলেজপাড়ায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এলাকাবাসীর কণ্ঠে ছিল একটাই আর্তি—“আমরা নিরাপদ নই।”
গত ১১ সেপ্টেম্বরের সশস্ত্র হামলায় পাঁচজন আহত হওয়ার পর থেকে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। হামলার পর শুধু মারধর বা হুমকি নয়, গ্যাং সদস্যরা মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, রাতের আঁধারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। থানায় অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের প্রশ্ন—“আমাদের রক্ষা করবে কে?”
স্থানীয়রা বলছেন, এ সন্ত্রাস একদিনে তৈরি হয়নি। গত এক বছর ধরে তারা এলাকায় দাপট দেখিয়ে আসছে। কিন্তু কেন তাদের এত সাহস? কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নীরব? এই প্রশ্ন এখন শুধু কলেজপাড়ার নয়, পুরো দেশের। তারা শুধু কলেজপাড়ায় নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য একটাই—অস্থিরতা সৃষ্টি করা, মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া, এবং ইউনুসের গদি শক্ত রাখা।
বাংলাদেশে মবের ঘটনা শুধু বিশৃঙ্খলা নয়; বরং তা রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা- মানাবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, ইউনূস সরকারের অধীনে গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে, কিন্তু এই সহিংসতার অনেকটাই মবের আড়ালে রাজনৈতিক ও উগ্রপন্থীদের হামলা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র নাগরিকদের নিরাপত্তা বিপন্ন করছে না, বরং সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ও লোপ পাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা মানাবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আগস্টে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা এর আগের মাসের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগষ্টে ২৩ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, যেখানে জুলাইতে সংখ্যা ছিল ১৬। তবে যেসব ঘটনা ঘটছে সবগুলোকে মব নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মব লেবেল লাগিয়ে, ইউনুস সরকারকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে পরিকল্পিত আক্রমণের জন্য। এতে তারা দায় এড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
সাম্প্রতিককালে অন্তত ১২টি জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে আক্রমণ। এসবগুলোই মবের ঘটনা হিসেবে বলা হয়েছে। তবে এগুলো প্রকৃতপক্ষে ছিল ইউনূস সরকারের সমর্থিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক সহিংসতা। যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বিএনপি, জামায়াত। এই আক্রমণগুলো নিঃসন্দেহে সমন্বিত ছিল। এখানে মবের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইউনূস সরকারের গোপন অনুমোদন কাজে লাগানো হয়েছে।
ধর্মের নামে যেসব মব করা হচ্ছে তাকে সহজভাবে দেখলে হবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনূস সরকারের মদদে বাংলাদেশে এক শয়ের বেশি সুফি মাজার ও দরবার শরীফে আক্রমণ হয়েছে উগ্র ইসলামপন্থীদের দ্বারা। বাস্তবে তথাকথিত এই তৌহিদি জনতা হল এসব ইসলামপন্থী গোষ্ঠী ও ইউনূসের মিত্র রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামি ইত্যাদি) কর্মী, অনুসারী এবং সমর্থক।
ইউনূস সরকারের প্রতিক্রিয়াও এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওপরে উল্লেখিত ঘটনায় ইউনূস সরকার নিন্দাও জানায়নি। বরং পরে তারা এই আক্রমণগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেখানে ইউনুস নিজে এই পরিকল্পিত সহিংসতাঁকে “বিপ্লবী মনোভাবের কার্যক্রম” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার প্রেস অফিস এসব মবকে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সৃষ্ট দাঙ্গা ও অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় এসব কিশোর গ্যাংয়ের নামে এসব মব সক্রিয় হয়েছে। বিদেশি অর্থায়ন, উগ্র সংগঠনের সহায়তা এবং কিছু প্রভাবশালী মহলের নীরব সমর্থনে এসব গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের লক্ষ্য—জনগণের মনে ভয় ঢুকিয়ে অস্থিরতা বজায় রাখা।
বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা এক টক শোতে বলেছেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে মবকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তার ভাষায়, “গত ৩৬৫ দিনে প্রায় ৩৮০টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করবে না, বাস করতেও চাইবে না। সরকার মবকে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে, কারণ তাদের কোনো তৃণমূল শক্তি নেই।”
তিনি আরও বলেন, “বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে, ব্রেইন ড্রেন বেড়ে গেছে। শিক্ষিত সমাজের সন্তানরা দেশ ছাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরা দায়িত্ব পালন না করে ক্ষমতা উপভোগ করছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, গোসাইবাড়ি কলেজপাড়া কলেজপাড়ার পঞ্চাশটি পরিবারের মতো পুরা দেশই আজ সন্ত্রাসে জর্জরিত। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশ অচিরেই ধ্বংসস্তূপে পরিণ হবে।
মন্তব্য করুন